

ভূমিকা
বিশ্ব নারী দিবস প্রতি বছর ৮ মার্চ নারীদের সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অর্জনকে উদযাপনের দিন হিসাবে পালিত হয়। কিন্তু এই উদযাপনের মাঝেও একটি অন্ধকার দিক আমাদের সমাজকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে নারীর প্রতি সহিংসতা। এই দিনটি কেবল নারীর ক্ষমতায়নের কথা স্মরণ করায় না, বরং নারীর বিরুদ্ধে চলমান বৈষম্য ও সহিংসতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ারও আহ্বান জানায়।
বিশ্ব নারী দিবসের প্রাসঙ্গিকতা:-
১৯০৮ সালে নিউইয়র্কে নারী শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের সূত্র ধরে ১৯১১ সালে প্রথম বিশ্ব নারী দিবস পালিত হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল নারীর সম-অধিকার, কর্মস্থলে ন্যায্য মজুরি এবং ভোটাধিকারের দাবি তুলে ধরা। বর্তমানে এই দিনটি নারীর অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জগুলোর প্রতিফলন ঘটায়। তবে নারী দিবসের রঙিন অনুষ্ঠানের আড়ালে লুকিয়ে থাকে একটি কঠিন বাস্তবতা: বিশ্বজুড়ে প্রতি তিনজন নারীর মধ্যে একজন শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার।
নারীর প্রতি সহিংসতার বর্তমান চিত্র:-
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বৈশ্বিকভাবে ৩৫% নারী নিজের জীবনকালে ঘরোয়া সহিংসতা বা যৌন নিপীড়নের শিকার হন। বাংলাদেশে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ: আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালে ৪,৫০০টির বেশি নারী সহিংসতার শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ধর্ষণ, এসিড সন্ত্রাস ও যৌতুকের জন্য হত্যার মতো ঘটনা রয়েছে। শহর থেকে গ্রামে, ঘরে-বাইরে—সহিংসতার ধরন ভিন্ন, কিন্তু প্রভাব সমান গভীর।
কারণ ও প্রভাব:-
নারীর প্রতি সহিংসতার মূলে রয়েছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের গভীর প্রোথিত মানসিকতা, যা নারীকে পুরুষের অধস্তন হিসেবে দেখে। অর্থনৈতিক নির্ভরতা, শিক্ষার অভাব, ও আইনের দুর্বল প্রয়োগ এই সমস্যাকে তীব্র করে। সহিংসতা কেবল শারীরিক ক্ষতি নয়, এটি নারীর মানসিক স্বাস্থ্য ধ্বংস করে, আত্মবিশ্বাস কমায় এবং সামাজিক উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করে। একটি মেয়ে শিশু যখন স্কুলে যাওয়ার পথে হয়রানির শিকার হয়, তখন তার শিক্ষাজীবন থমকে যায়—এটি শুধু তার ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, সমাজেরও ক্ষতি।
বিশ্ব নারী দিবস ও পরিবর্তনের উদ্যোগ:-
বিশ্ব নারী দিবসে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। র্যালি, সেমিনার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে #MeToo এর মতো প্রচারণাগুলো নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার বিষয়ে সচেতনতা বাড়ায়। বাংলাদেশে এই দিনে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলো নারী শিক্ষা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও আইনি সহায়তার উপর জোর দেয়। উদাহরণস্বরূপ, “নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন” সংশোধনের মাধ্যমে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করা হয়েছে।
সামাজিক পরিবর্তনের উপায়:-
১.শিক্ষা ও সচেতনতা:- লিঙ্গ সমতার শিক্ষা পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ছেলেমেয়ে উভয়কে সম্মান ও সহানুভূতির শিক্ষা দিতে হবে।
২. অর্থনৈতিক স্বাধীনতা:- নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো গেলে তারা সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে।
৩. আইনের কঠোর প্রয়োগ:- দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন ও ভিকটিমদের জন্য সহায়তা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন।
৪.সাংস্কৃতিক পরিবর্তন:-নারীকে “সম্পত্তি” না দেখে “সমঅংশীদার” হিসেবে গণ্য করার মানসিকতা গড়ে তুলতে সামাজিক প্রচারণা চালানো।
বিশ্ব যা কিছু মঙ্গল চির কল্যাণকর অর্ধেক দার করিয়েছে নারী অর্ধেক তার নর কাজী নজরুল ইসলাম।
নারীকে নারীর হিসেবে নয়,মানুষ হিসেবে দেখার মানসিকতার প্রয়োজন।
উপসংহার:-
বিশ্ব নারী দিবস কেবল একটি প্রতীকী দিন নয়—এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ করা সমাজের সকল স্তরের দায়িত্ব। এই দিনটি যেন শপথ নেওয়ার দিন হয়: একটি সমাজ গঠনের যেখানে নারীরা নিরাপদে বাঁচবে, স্বপ্ন দেখবে এবং নিজেদের মেধায় সমৃদ্ধি গড়ে তুলবে। নারী-পুরুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে একটি সহিংসতামুক্ত বিশ্ব নির্মাণ করতে, যার ভিত্তি হবে সমতা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার।
মোঃ আতাউর রহমান লেখক কবি ও কলামিষ্ট