

রমজান মাস ইসলামের একটি পবিত্র সময়, যেখানে সিয়াম বা রোজা পালনের মাধ্যমে মুসলমানরা আত্মশুদ্ধি, আত্মসংযম ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করে। তবে এই সাধনা কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতেই সীমাবদ্ধ নয়; এর গভীরে নিহিত রয়েছে বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবতার অনন্য বার্তা। রমজানের সিয়াম শুধু ক্ষুধা-তৃষ্ণা নিয়ন্ত্রণের শিক্ষাই দেয় না, বরং এটি সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা ও ঐক্যের চেতনাকে জাগ্রত করে। ন্যায় বিচার মানবিক মুক্তি ও শান্তির পথে অনুপ্রেরণা যোগায়।
সিয়ামের মাধ্যমে আত্মিক ও মানবিক উৎকর্ষ
ইসলামে রোজার প্রধান উদ্দেশ্য হলো “তাকওয়া” অর্জন, অর্থাৎ আল্লাহভীতি ও নৈতিক সচেতনতা। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর; যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো”(সুরা আল-বাকারা, ২:১৮৩)। এই তাকওয়া কেবল ব্যক্তিগত পবিত্রতা নয়, বরং সমাজের প্রতিটি স্তরে ন্যায় ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার চাবিকাঠি। রোজাদার ব্যক্তি ক্ষুধা-তৃষ্ণার কষ্ট অনুভব করার মাধ্যমে দরিদ্র ও অভাবগ্রস্তদের দুঃখ উপলব্ধি করে, যা তাকে স্বার্থপরতা থেকে মুক্ত করে মানবসেবায় উদ্বুদ্ধ করে।সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন
#সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন
রমজান মুসলিম উম্মাহর মধ্যে অদৃশ্য এক ঐক্যের সূত্র তৈরি করে। সারা বিশ্বের কোটি কোটি মুসলিম একই ভাবে রোজা রাখে, ইফতার ও সাহরি গ্রহণ করে এবং তারাবিহরের নামাজে অংশ নেয়।
এই সমন্বিত কর্মকাণ্ড জাতি, বর্ণ ও ভাষার বিভেদ মুছে ফেলে। মসজিদে দাঁড়িয়ে ধনী-দরিদ্র, শ্বেত-কালো নির্বিশেষে সবাই কাতারে কাতারে শামিল হয়—এটি ইসলামের সর্বজনীন ভ্রাতৃত্বেরই প্রতীক। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই” (সহিহ বুখারি)। রমজান এই ভ্রাতৃত্বকে শাণিত করে, পার্থিব বৈষম্য ভুলে গিয়ে আধ্যাত্মিক সমতার শিক্ষা দেয়।
#মানবতার প্রতি দায়বদ্ধতা
রমজানের অন্যতম স্তম্ভ হলো জাকাত ও সদকা। এই মাসে সম্পদশালীরা তাদের সম্পদের একটি অংশ গরিব-অসহায়দের মধ্যে বিতরণ করে, যা সামাজিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জাকাত কেবল অর্থনৈতিক সহায়তা নয়, এটি মানবিক সংহতিরও প্রতীক। রোজার সময় ইফতারের দাওয়াত, মিসকিনদের সাহায্য ও সমাজসেবামূলক কাজের মাধ্যমে মুসলিম সম্প্রদায় তাদের দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয়। পবিত্র হাদিসে আছে, “যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, তার জন্য রয়েছে রোজাদারের সমান সওয়াব” (সুনান তিরমিজি)। এভাবে রমজান ব্যক্তিকে সম্প্রদায়ের প্রতি,সম্প্রদায়কে বিশ্বের প্রতি সংযুক্ত করে। মানুষ সবাই আল্লাহর সৃষ্টি
সমান মর্যাদার, যা সাম্যবাদকে স্বীকৃতি দেয়।
বৈশ্বিক সংকটে রমজানের শিক্ষা*
আজকের বিশ্বে যেখানে যুদ্ধ, দারিদ্র্য ও বৈষম্য মানবতাকে ক্ষতবিক্ষত করছে, সেখানে রমজানের শিক্ষা আরও প্রাসঙ্গিক। রোজা আমাদের শেখায়—অপরের ক্ষুধা মেটানো, অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখা। গাজা, ইয়েমেন বা মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের মতো সংকটাপন্ন এলাকায় রমজানের তাগিদে মানবিক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া বিশ্ব ভ্রাতৃত্বেরই প্রকাশ। ইসলামের দৃষ্টিতে মানবতা হলো সর্বোচ্চ ধর্ম,তোমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সেই, যে মানুষ্যের প্রতি সবচেয়ে বেশি কল্যাণকর”(সুনান আবু দাউদ)।
একতা ও মানবিক পথের দিশা
রমজান মাস মুসলিমদের জন্য আত্মপর্যালোচনার সময় হলেও এর মূল বার্তা সার্বজনীন। এটি শেখায় যে ধর্ম, বর্ণ বা জাতি নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের মর্যাদা সমান। সিয়ামের মাধ্যমে অর্জিত সংযম, সহানুভূতি ও ন্যায়পরায়ণতা যদি ব্যক্তি ও সমাজের আচরণে প্রতিফলিত হয়, তবে একটি শান্তিপূর্ণ ও সমতাভিত্তিক বিশ্ব গঠন সম্ভব। আসুন, রমজানের এই পবিত্র সময়ে আমরা স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে মানবতার সেবায় নিজেদের নিয়োজিত করি,এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
মোঃ আতাউর রহমান। লেখক কবি ও কলামিষ্ট