
“বীরকন্যা প্রীতিলতার জন্মদিনে গভীর শ্রদ্ধা‘
বীরকন্যাও প্রীতিলতা জন্মেছিলেন ১৯১১ সালের ৫ মে। ‘চট্টগ্রামে পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ দেয়া ও বিজয় এবং বিজয় লাভের পর ফিরে আসার মুহূর্তে লুকিয়ে থাকা ইংরেজ সেনার বন্দুকের গুলিতে আহত হলে বিপ্লবীদের নিয়ম অনুযায়ী ধরা না দিয়ে এই সেনাপতি বেছে নিয়েছিলেন আত্মাহুতির পথ।
তারিখ ছিল ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৩২ সাল। বছর হিসেবে তখন তার বয়স মাত্র ২১ বছর।তারুণ্যের টগবগানী ২১ বছরের এই কন্যাটিকে করে তুলেছিল জননী জন্মভূমিকে পরাধীনতা থেকে মুক্তি দেয়ার লক্ষ্যে সংগঠিত সশস্ত্র বিদ্রোহের এক অমিততেজী যোদ্ধা।এই যোদ্ধা নিজে একদিকে মহা পরাক্রমশালী শত্রু সেই ইংরেজ শাসকদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে জয়ী হন, শহীদ হয়ে ভবিষ্যত মেয়েদের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়ান অন্যদিকে ‘মাস্টার দা’ সূর্য সেনের রিপাবলিকান আর্মিতে পুরুষের মতো নারীরও অধিকার আছে সদস্য হয়ে ভূমিকা পালনের, পুরুষের মত নারীরও অধিকার আছে দেশকে ভালোবেসে জীবন দেয়ার- এই ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করার মধ্য দিয়ে বিশ্বাস ও অঙ্গীকারের বাস্তব রূপ দিয়েছিলেন ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর তারিখে। একজন মানুষ বিশেষত একজন তরুণ ২১ বছর বয়সেই কিভাবে মরণ স্বপন দেখে আধার পথে পাড়ি দিলেন সে বিষয়টি আজও স্বপ্ন দেখা স্বাপ্নিক তরুণ-তরুণীদের কাছে গুরুত্ব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রীতিলতা তার যাপিত জীবনে যে শিক্ষা নিয়েছিলেন তা দিয়ে তিনি নানাভাবে নিজেকে ঢেলে সাজিয়েছেন, নিজেকে তৈরি করেছেন নানামুখী কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে যা দিয়ে সঞ্চয় করেছেন শক্তি, সাহস আর অমিত তেজ। যে তেজ আর সাহস তাকে অস্ত্র হাতে নিয়ে চট্টগ্রাম ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের মত লোমহর্ষক ঘটনার যোদ্ধাদের নেতা হিসেবে অভিষিক্ত করতে মাস্টারদা সূর্যসেনকে প্রভাবিত করেছিল। তার তেজোদীপ্ত সেই সাহসই তাকে কালের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করে ওপনিবেশিক আমলে বৃটিশ শাসকের বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র শহীদ নারীযোদ্ধার মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছিল।প্রীতলতার যাপিত জীবনে ছিল মাতৃভূমিকে ভালোবাসার দেশবাসীর মধ্যে এমনও অনেকে আছেন, যাঁহারা বলিবেন যে- ভারতীয় নারীত্বের উর্ধ্বতন আদর্শে লালিত একটি নারী কি করিয়া নরহত্যার মত এই ভীষণ হিংস্র কাজে লিপ্ত হইল। দেশের মুক্তি-সংগ্রামে নারী ও পুরুষের পার্থক্য আমাকে ব্যথিত করিয়াছিল। যদি আমাদের ভাইয়েরা মাতৃভূমির জন্য যুদ্ধে অবতীর্ণ হইতে পারে, আমরা ভগিনীরা কেন উহা পারিব না? ইতিহাসে অনেক উদাহরণ আছে, রাজপুত রমণীরা অসীম সাহসের সহিত রণাঙ্গণে যুদ্ধ করিতেন এবং স্বদেশের স্বাধীনতা ও নারীত্বের মর্যাদা রক্ষার জন্য তাহারা শত্রুর প্রাণ সংহার করিতে দ্বিধাবোধ করিতেন না। ইতিহাসের পৃষ্ঠা এইরূপ আরও কত নারীর বীরত্বগাঁথায় পূর্ণ। তবে কেন আমরা, আজিকার ভারতীয় নারীরা বিদেশীর দাসত্ব শৃংখল হইতে নিজের দেশকে পুনরুদ্ধার করিবার জন্য এই মহান যুদ্ধে যোগদান করিব না? যদি বোনেরা ভাইদের সঙ্গে কংগ্রেসের সত্যাগ্রহ আন্দোলনে যোগ দিতে পারে, সশস্ত্র বিদ্রোহে যোগদানে তাহাদের বাধা কি? সশস্ত্র বিদ্রোহে অন্য দেশের বহু নারী যোগদান করিয়াছে, তবে কেন ভারতীয় নারীরা বিপ্লবের এই পন্থাকে অন্যায় বলিয়া মনে করিবে? নারীরা আজ কঠোর সংকল্প নিয়াছে যে, আমার দেশের ভগিনীরা আজ নিজেকে দুর্বল মনে করিবেন না। সশস্ত্র ভারতীয় নারী সশস্ত্র বিপদ ও বাধাকে চূর্ণ করিয়া এই বিদ্রোহ ও সশস্ত্র মুক্তি আন্দোলনে যোগদান করিবেন এবং তাহার জন্য নিজেকে তৈয়ার করিবেন- এই আশা লইয়াই আমি আজ আত্মদানে অগ্রসর হইলাম।” তাঁর আত্মাহুতি গোটা দেশ শুধু নয় ইংরেজ শাসকদেরও হকচকিত করে দেয়। সাহসে ভয় করে বেয়নেট লাগানো রাইফেল নিয়ে ঘন্টাখানেক পরে পুলিশ, মিলিটারী ও গোয়েন্দা কর্মচারীরা ধীরে ধীরে আসে। সরকারি ডাক্তার এই যোদ্ধাকে মৃত বলে ঘোষণা করলে মৃতদেহ ‘পোস্টমর্টেম’ করার জন্য পাঠানো হয়। পোস্টমর্টেম করতে গিয়ে যখন তাঁর সামরিক পোশাক খোলা হয় তখনই প্রকাশ হয় যে, দেহটি একজন নারীর কোন তরুণ যুবক পুরুষের নয়। তাঁর দেহতল্লাসীর পর পাওয়া যায়:ও সংগ্রামে আত্মদানের যে বলিষ্ঠ স্বাক্ষর রেখেগেছেন আজকের প্রেক্ষাপটেও তার রাজনৈতিক এবং ঐতিহাসিক মূল্য অপরিসীম বীরকন্যা প্রীতিলতা আজকের নারীর সংগ্রাম মহাপরাক্রমশালী সমাজ মানসের বিরুদ্ধে। দেশ সমাজ অগ্রসর হচ্ছে- বিশ্ব পরিসরে অগ্রগতির সূচক ও প্রতিনিয়ত চিহ্নিত হচ্ছে। বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নানা ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে- নানা প্রতিবন্ধকতা পার হতে হতে মেয়েরা দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, সাংস্কৃতিক সামাজিক ক্ষেত্রে অগ্রসর হওয়ার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হচ্ছে কিন্তু এ সবের সাথে নতুন নতুন বৈরী পরিবেশ-প্রতিবন্ধকতা ও ক্রমাগত সামনে আসছে। আজকের সচেতন নারীর এক বড় অংশ তরুণ সম্প্রদায় করা উন্নয়ন সূচকে এক বড় শক্তি হিসেবে দাঁড়াচ্ছে, কিন্তু ৮৬ বছর আগের প্রীতিলতার যে সংগ্রাম নারীর মানুষ হিসেবে, দেশপ্রেমিক হিসেবে, নাগরিক হিসেবে প্রাপ্য সম্মান, অধিকার, মর্যাদা ভোগ ও দায়িত্ব পালনের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম আজও চলছে- যে পিতৃ তান্ত্রিক মানসিকতা সে সময় সমাজে বহমান ছিল নারীর প্রতি সমাজ মানসের আচরণ ও নির্যাতনের যে রূপ তিনি সময়ের বিবর্তনে তা ভিন্নরূপে এসে হাজির হয়েছে। নারীর মানব সন্তানের স্বীকৃতি ও অনুভবের জায়গায় তাকে ভোগ্যপণ্য হিসেবে দেখার মানসিকতাকে আজও প্রবলভাবে মোকাবেলা করতে হচ্ছে। নারীর প্রতি শারীরিক নির্যাতনের ভয়াবহ মাত্রা ও ধর্ষণ নারীর এগিয়ে চলার পথে বিভিন্নমুখী প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। তরুণ প্রজন্মের নারীর এগিয়ে চলার পথে কর্মক্ষেত্র, পারিবারিক দায়-দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বৃহত্তর সামাজিক জীবনে তার অনুকূল পরিবেশের অভাবের চ্যালেঞ্জ ও তাকে মোকাবেলা করতে হচ্ছে। জনজীবনে অগ্রসর নারী পারিবারিক সামাজিক জীবনে অধিকার প্রাপ্তির সংগ্রামকে এখনও কঠিনভাবে মুখোমুখি হচ্ছে। রাষ্ট্রের কাছে সমঅধিকারের স্বীকৃতি জনজীবনে থাকলেও ব্যক্তিজীবনে তার অনুপস্থিতি,সমঅধিকার কার্যকর করার সুনির্দিষ্ট কার্যক্রম ও তার ফলাফল নির্ভয়ে বাস্তবায়ন। সমাজে আজ তাই প্রয়োজন প্রীতিলতার তারুণ্যের প্রয়াসের মতো এই প্রজন্মের তারুণ্যের ঘা দিয়ে আধামরা সমাজকে নাড়া দেয়ার মতো উদ্যোগ, সাহস নিষ্ঠা আর একাগ্রতা। নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠার এই সংগ্রামে রামসুন্দর বসাকের সেই অমোঘ বাক্য- “বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচাগ্র মেদিনী”। আজ সমাজমানস পরিবর্তনে নারীর জন্যে অমোঘ সত্য হিসেবেই দাঁড়িয়েছে। সেই সময়ের পরীক্ষায় প্রীতিলতার ২১ বছরের তারুণ্য জয়ী হয়েছে নানা ঘাত-প্রতিঘাত মোকাবেলা করে আজকের মেয়েদের কাছে তারুণ্যের নতুন রূপ-তারুণ্যের নিষ্ঠা, অঙ্গীকার, আদর্শবাদিতা, সাহস মর্যাদা পরিবর্তিত রূপে হাজির করবে সমাজ মানসকে। সকলে মিলে গড়ে তুলবে দেশ ও সমাজের সকল অনাচারের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ। এই কাজে অনুপ্রেরণা আর বাতিঘর হয়ে আছেন, থাকবেন বীরকন্যা প্রীতিলতা। মাথার পাগড়ী, যা খোলার পরই তার দীর্ঘ চুল খুলে পড়ে। পাহাড়তলী ইউরোপীয়ান ক্লাবের প্ল্যান ১টি, একটি হুইসেল। প্রীতিলতার ফটোসহ ‘ভারতীয় রিপাবলিক্যান আর্মি’র চট্টগ্রাম শাখার সভাপতি সূর্যসেন স্বাক্ষরিত লাল রংএর ইস্তাহার ১প্রীতিলতার সহস্ত লিখনি একটি কাগজে মুড়ে পোশাকের ভেতরে সযত্নে রাখা ছিল।সামরিক পোশাকের এক বুক পকেটে ইউরোপীয়ান ক্লাবের প্ল্যান আর অন্যটিকে শহীদ রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের একটি ফটো ছিল।প্রীতিলতাদের সংগ্রামে ছিল ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসকের হাত থেকে পরাধীন দেশকে মুক্ত করার লক্ষ্য “প্রীতিলতা তার গভীর দেশপ্রেমকে পাথেয় করে তৎকালীন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন।
লেখক -শারমিন রেজা লোটাস